স্টাফ রিপোর্টার : স্কুল ছুটির পর সহপাঠীদের ধাক্কায় মাটিতে পড়ে বাম হাত ভেঙে যায় তৃতীয় শ্রেণির শিক্ষার্থী মোসা. নুসরাত জাহান রাইসার। তবে গুরুতর আহত অবস্থায় দীর্ঘ সময় স্কুলের একটি বেঞ্চে কাতরালেও তাকে দেওয়া হয়নি প্রয়োজনীয় প্রাথমিক চিকিৎসা। এমনকি স্কুলের ফার্স্ট এইড বক্সেও পাওয়া যায়নি প্রয়োজনীয় সরঞ্জামসহ এক টুকরো তুলোও।
ঘটনাটি ঘটেছে গত শনিবার (১২ সেপ্টেম্বর) রাজশাহী নগরীর উপশহর সেক্টর-২ এলাকায় অবস্থিত সৃষ্টি সেন্ট্রাল স্কুল অ্যান্ড কলেজে। এ ঘটনায় স্কুল কর্তৃপক্ষের দায়িত্বহীনতা ও অব্যবস্থাপনা নিয়ে ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন রাইসার পরিবারসহ স্থানীয় অভিভাবকরা।
পরিবারের অভিযোগ, স্কুল ছুটির পর সহপাঠীদের ধাক্কায় পড়ে গিয়ে রাইসার বাম হাত ভেঙে যায়। এরপর স্কুল কর্তৃপক্ষ তার পরিবারকে ফোন করে জানায়, রাইসা খেলতে গিয়ে পড়ে গেছে।
খবর পেয়ে রাইসার মা দ্রুত স্কুলে ছুটে যান। সেখানে গিয়ে তিনি দেখতে পান, প্রচণ্ড ব্যথায় কাতরাচ্ছে তার সন্তান। ভাঙা হাতটি ঝুলে ও বাঁকা অবস্থায় থাকলেও শিশুটিকে হাসপাতালে নেওয়ার কোনো ব্যবস্থা করা হয়নি।
রাইসার মা শিলা অভিযোগ করে বলেন, আহত রাইসাকে একটি বেঞ্চে শুইয়ে রাখা হয়েছিল এবং মাথায় সামান্য পানি দেওয়া ছাড়া আর কোনো প্রাথমিক চিকিৎসা দেওয়া হয়নি।
সন্তানের এমন অবস্থা দেখে রাইসার মা ঘটনাস্থলেই জ্ঞান হারান। পরে শিশুটির বাবা ও পরিবারের সদস্যরা স্কুলে গিয়ে তাকে উদ্ধার করে দ্রুত হাসপাতালে নিয়ে যান। চিকিৎসকের পরীক্ষা-নিরীক্ষার পর তার হাতে প্লাস্টার করা হয়। সন্ধ্যায় তাকে বাড়িতে ফিরিয়ে নেওয়া হয়।
পরিবারের অভিযোগ, ঘটনার পরও স্কুল কর্তৃপক্ষ শিশুটির চিকিৎসা বা শারীরিক অবস্থার বিষয়ে কোনো খোঁজ নেয়নি। পরে বিষয়টি নিয়ে কথা বলতে গেলে অভিভাবকদের সঙ্গে অসংবেদনশীল আচরণ করা হয়েছে বলেও অভিযোগ করেন।
ঘটনার সত্যতা যাচাই করতে সরেজমিনে স্কুলে গিয়ে ফার্স্ট এইড বক্সেরও বেহাল চিত্র পাওয়া যায়। জরুরি চিকিৎসার জন্য থাকা বক্সে তুলার মতো প্রয়োজনীয় সামগ্রীও ছিল না বলে অভিযোগ উঠে।
বিষয়টি স্বীকার ও দুঃখ প্রকাশ করে সৃষ্টি সেন্ট্রাল স্কুল অ্যান্ড কলেজের অধ্যক্ষ আব্দুর রাজ্জাক বলেন, ঘটনাটি আসলেই দুঃখজনক। শিক্ষার্থীরা আমাদেরই সন্তান। এসময় আমাদের রাইসার প্রতি আরও যত্নবান হওয়ার প্রয়োজন ছিল। তবে “প্রাথমিক চিকিৎসা বক্সে এসব না থাকা নিশ্চিতভাবেই গাফিলতি ও অপরাধ। তবে আমরা আমাদের সাধ্যমতো চেষ্টা করেছি। বাচ্চারা খেলতে গিয়ে এমন দুর্ঘটনাটি ঘটে গেছে।”
অনুসন্ধানে প্রতিষ্ঠানটির শিক্ষার্থীদের নিরাপত্তা নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে। প্রায় দুই হাজারের বেশি শিক্ষার্থী পড়াশোনা করলেও তাদের খেলাধুলার জন্য নেই কোনো মাঠ। চোখে পড়ে সংকীর্ণ জায়গা।
স্কুলের প্রধান ফটকের সামনের একটি অংশে অভিভাবকদের বসার জায়গা এবং অন্য পাশে মোটরসাইকেল ও সাইকেল রাখা হয়। মাঝখানের সংকীর্ণ পথ দিয়েই প্রতিদিন বিপুলসংখ্যক শিক্ষার্থী চলাচল করে। পর্যাপ্ত খেলার মাঠ ও উন্মুক্ত জায়গার অভাব এবং নিরাপত্তা ব্যবস্থার ঘাটতি থাকায় দুর্ঘটনার ঝুঁকি বাড়ছে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
স্থানীয় সাংস্কৃতিক ব্যক্তিত্ব হাসিব পান্না বলেন, “সবচেয়ে দুঃখজনক বিষয় হলো, চরম যন্ত্রণায় বাচ্চাটা দীর্ঘক্ষণ স্কুলে পড়ে ছিল। বাবা-মা নিশ্চিন্তে সন্তানকে স্কুলে পাঠান। এমন পরিস্থিতিতে স্কুল কর্তৃপক্ষই তাকে দ্রুত হাসপাতালে নিতে পারত। অথচ বাবা-মা এসে তাকে হাসপাতালে নিয়ে গেছেন। যাদের বাবা-মা দ্রুত আসতে পারবেন না, তাদের সন্তানদের কী হবে?”
তিনি আরও বলেন, বিষয়টি শিক্ষাবোর্ড ও সরকারের গুরুত্ব দিয়ে দেখা উচিত। একটি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে শিক্ষার্থীদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা অত্যন্ত জরুরি।
এ বিষয়ে বোয়ালিয়া থানা প্রাথমিক সহকারী শিক্ষা অফিসার রোজি খন্দকার বলেন, “অভিভাবকরা লিখিত অভিযোগ দিলে আমরা তদন্ত সাপেক্ষে দ্রুত আইনি ও প্রশাসনিক ব্যবস্থা নেব। সবেমাত্র এই বেসরকারি স্কুলগুলোকে সরকারের নিবন্ধনের আওতায় আনা হয়েছে। সামনে এদের দেখভাল ও তদারকির দায়িত্ব সরাসরি আমরাই পালন করব।”
এ ঘটনায় সংশ্লিষ্ট মহলে সৃষ্টি স্কুলের শিক্ষার্থীদের নিরাপত্তা ব্যবস্থা, ফার্স্ট এইড সুবিধা এবং দুর্ঘটনার পর কর্তৃপক্ষের ভূমিকা নিয়ে উঠেনা নানা প্রশ্ন। অভিযোগের সুষ্ঠু তদন্ত করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি জানিয়েছেন সচেতন অভিভাবকরা।
আরবিসি/১২ সেপ্টেম্বর'২৬/ রোজি